গ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে খাদ্য সংরক্ষণের সংজ্ঞা:
বিভিন্ন গ্যাসের সমন্বয়ে গঠিত প্রাকৃতিক বাতাসে উপস্থিত অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের আনুপাতিক হারকে পরিবর্তন করে খাদ্যশস্যের শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে খাদ্য সংরক্ষণ করাকে গ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে খাদ্য সংরক্ষণ বলে।
গ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে খাদ্য সংরক্ষণের মূলনীতি:
টাটকা ফলমূল ও শাকসবজি এবং দানাদার শস্য, তৈলবীজ, ডাল ইত্যাদি সবকিছুই জীবন্ত থাকে এবং শ্বাস-প্রশ্বাস চালায়। অর্থাৎ এগুলো অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং কার্বন ডাই – অক্সাইড ত্যাগ করে। ফলে তাপের আকারে শক্তি নির্গত হয়। এ নির্গত তাপের পরিমাণ নির্ভর করে শস্যের পরিমাণ ও প্রকৃতির উপর এবং স্টোরেজ লাইফ নির্ভর করে জীবন্ত শস্যের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতির উপর । কাজেই শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করে শস্যের স্টোরেজ লাইফ বৃদ্ধি করা যায় ।
খাদ্যদ্রব্যের স্টোরেজ লাইফ প্রধানত দু’উপায়ে বৃদ্ধি করা যায়। যেমন
(i ) কনট্রোন্ড অ্যাটমোসফেয়ারিক বা গ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।
(ii ) খাদ্যদ্রব্যাদিকে ঠাণ্ডায় রেখে।
শ্বাস-প্রশ্বাসের ( Respiration ) উপর ভিত্তি করে ফলের শ্রেণিবিভাগ:
শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে ফুলকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন:
(i ) ক্লাইমেট্রিক ফুটস(Climetric fruits )
( ii ) নন – ক্লাইমেট্রিক ফুটস(Non – climetric fruits )
( ii ) ইন্টারমেডিয়েট ফুটস(Intermediate fruits )
ক্লাইমেট্রিক ফুটসঃ যে সমস্ত ফল গাছ থেকে পাড়ার পর পাকানো হয় এবং যেগুলোর শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি স্বাভাবিক মাত্রার সে সমস্ত ফলকে ক্লাইমেট্রিক ফুটস বলে। যেমন-আম, কলা, নাসপতি, সফেদা, আতা ইত্যাদি।
নন-ক্লাইমেট্রিক ফুটস: যে সকল ফল সংগ্রহকালীন সময়েই পাকে সে সকল ফলকে নন-ক্লাইমেট্রিক ফুটস বলে । যেমন-‘ আঙ্গুর, আনারস, লিচু ইত্যাদি সাইট্রাস ফ্রটস।
ইন্টারমেডিয়েট ফুটস: যে সকল ফল ক্লাইমেট্রিক এবং নন ক্লাইমেট্রিক ফুট এর মধ্যবর্তী সময়ে পাকে তাকে ইন্টারমেডিয়েট ফুটস বলে । যেমন- পেয়ারা, টমেটো, পেঁপে ইত্যাদি হল ইন্টারমেডিয়েট ফুটস ।
গ্যাস গুদামজাতকরণের মাধ্যমে খাদ্য সংরক্ষণ:
খাদ্যগুদামে ফল, সবজি ও অন্যান্য দানাদার শস্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্যের স্টোরেজ লাইফ বৃদ্ধি করা যায়। এ পদ্ধতিতে সদ্য সংগ্রহকৃত ফলের শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে তার পাকার সময় বাড়ানো বা কমানো যায়। ফল শ্বাসকার্য চালানোর সময় অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। এটাই হল শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি যত বেশি হবে ফলও তত দ্রুত পাকবে । কাজেই ফল ও সবজি যাতে দ্রুত না পাকে অর্থাৎ সেটার স্টোরেজ লাইফ যাতে বৃদ্ধি পায় সেজন্য শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি কমিয়ে আনা হয়। খাদ্য গুদামে বাড়তি কিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড যোগ করে ফল এবং সবজির শ্বাস-প্রশ্বাস ও রাসায়নিক ক্রিয়া বিলম্বিত করা হয় । এটাই ফল সবজি সংরক্ষণের আধুনিক পদ্ধতি । বর্তমানে এ পদ্ধতি ব্যবহার করে একদেশ থেকে অন্য দেশে ফল-সবজি সরবরাহ করা হচ্ছে । হল্যান্ডে গোলআলুর বীজ গ্যাস গুদামজাত তথা গ্যাস নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হয়। কনট্রোল্ড অ্যাটমোসফিয়ার এবং কোল্ড স্টোরেজ উভয় পদ্ধতির সমন্বয় করতে পারলে সংরক্ষণের ফলাফল অনেক ভাল হয়। সবচেয়ে ভাল হয় যদি
- গুদামের তাপমাত্রা কম থাকে,
- অক্সিজেনের পরিমাণ কম এবং
- কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেশি হয়।
সাধারণত ফল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গ্যাস মিশ্রণে ১০ % অক্সিজেন এবং ১১ % কার্বন ডাই-অক্সাইড রাখা হয় ।
কনট্রোল্ড অ্যাটমোসফিয়ারিক স্টোরেজ এর সুবিধা:
কনট্রোন্ড আটমোসফিয়ারিক স্টোরেজ পদ্ধতি ফল-সবজি সংরক্ষণের একটি আধুনিক পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে নিম্নলিখিত সুবিধাসমূহ পাওয়া যায়-
- ফল পাকার সময় দীর্ঘায়িত হয়।
- শাকসবজি শক্ত হওয়া এবং পাতার রঙ হলুদ হওয়ার প্রবণতা হ্রাস পায়।
- পচনের সম্ভাবনা কমে যায় এবং ফুড প্রিজারভেশন।
- ফল ও শাকসবজির রোগ বিস্তারের প্রবণতা হ্রাস পায়।
গ্যাস গুদামজাত প্রক্রিয়ায় মাংস সংরক্ষণ:
কাঁচা মাংসে প্রধানত সিউডোমোনাস নামক ব্যাকটেরিয়া থাকে। এই ব্যাকটেরিয়া অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে না। কাজেই অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে এ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ করা যায়। গুদামের তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা বেশি থাকা সত্ত্বেও কার্বন ডাই-অক্সাইড এর পরিমাণ ২০ % এ উন্নীত করে স্লাইম উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি এ পদ্ধতিতে রোধ করা সম্ভব।