Food Ingredients

আল্লাহ তায়ালা একমাত্র রিযিক দাতা

বেকারী খাদ্যদ্রব্য-(Bakery Products)

১.ভূমিকা ( Introduction) :

বেকারী খাদ্য বলতে আমরা সাধারণত পাউরুটি , কেক , বিস্কুট ইত্যাদিকে বুঝি । বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে অ করে শহর পর্যন্ত যেসব মালব্য অত্যন্ত ব্যাপকভাবে বাজারজাত তুরা হয়ে থাকে তার মধ্যে বেকারী হন । উল্লেখযােগ্য । সকালের নাস্তা ও অন্যান্য হালকা খাদ্যের ক্ষেত্রে বেকারী খাদ্যের ব্যবহার অনস্বীকার্য । প্রক্রিয়াজাতকরণ কৌশল সহজ ও নিরাপত্ এবং সংরক্ষণ পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে সহজ ও ঝামেলামুক্ত ।

বেকারী দ্রব্যের খাদ্যমান অনেক । রেখেছে । দেশের অর্থনৈতিক উন্নত বিধায় অতি সহজে দেশের সর্বত্র একটি বড় কাজ হিসেবে সাফল্যজনকভাবে উন্নয়নে বেকারী শিল্প একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং বেকারী খাদ্য জনগণের স্বাস্থ্য গঠনে সহায়তা করে । সেই সাথে খাদ্যশিল্পের মধ্যে বেকারী শিল্প একটা বড় অংশ দখল করে আছে । এ সকল বেকারী খাদ্য বিভিন্ন কোম্পানি ভিন্ন ভিন্ন ট্রেভ নামে বাজারজাত করে থাকে ।

প্রক্রিয়াজাতকারীরা বিদেশ থেকে এখন অনেক আধুনিক পদ্ধতি নিয়ে এসেছেন । এবং ব্যবহার করছেন । মােড়কের গুণগত মানেরও অনেক উন্নতি ঘটেছে । কাজেই আমাদের দেশে উৎপাদিত এসব বেকাৱী খাদ্যসামগ্রী রপ্তানিযােগ্য পণ্যে রূপ নিয়েছে । এ সকল বেকারী খাদ্যদ্রব্যের এবং তাদের প্রস্তুতপ্রণালীর একটা মৌলিক ধারণা দেয়ার জন্য সংক্ষেপে সেগুলাের প্রস্তুতপ্রণালী আলােচনা করা হল ।

খামিরের উপর ভিত্তি করে বেকারী খাদ্যকে নিম্নোক্ত ভাগে ভাগ করা যায় , যথা—

১। ঈস্ট ব্যবহৃত খামিরের বেকারী খাদ্য ( YeastLeavencd Bakery Products )

২। রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহৃত খামিরের বেকারী খাদ্য ( CheTically Leavened Bakery Products )

৩। বায়ু ব্যবহৃত আমিরের বেকারী খাদ্য ( Air Leavened Bakery Products ) এবং

৪। খামির ছাড়া বেকারী খাদ্য ( Unleavened Bakery Products ) ।

বেকারী খাদ্যদ্রব্যের কাঁচামালের তালিকা ( List the raw materials of bakery products ):

১.কাচামাল ( Raw materials ):

বেকারী শিল্পে বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়ে থাকে । গুণগত মান এবং প্রয়োজনীয় স্বাদের কথা বিবেচনা করে এ সকল কাঁচামাল বিভিন্ন অনুপাতে মিশ্রিত করে ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন ধরনের বেকারী খাদ্য তৈরি করা হয় , যেমন কেক , পেস্ট্রি , পাউরুটি ইত্যাদি ।

বেকারী খাদ্যে যে সকল কাচামাল ব্যবহৃত হয় , তা নিচে দেয়া হল :

( ক ) গম:  যেমন- আটা ও ময়দা

( খ ) আমি দ্রব্য । যেমন- ঈস্ট , বার্ন , হোপস্ ইত্যাদি।

( গ ) গাজানো  রস । যেমন- তালের রস।

( ঘ ) ল্যাকটিক এসিড ।

( ঙ ) খাদ্য লবণ ।

(চ) , দুগ্ধজাত দ্রব্য । যেমন- ঘনীভূত দুধ ( Condensed Milk ) , গুড়াদুধ ( ফ্যাটসহ বা ফ্যাটবিহীন ) , ছানার পানি  ( Whey ) এবং কার্ড ( Curd )

( ছ ) চর্বি উদজানিত তেল বা পরিশোধিত তেল অথবা ঘি ।

( জ ) মার্জারিন বা তাদের মিশ্রণ।

( ঝ ) গুটেন

( ঞ ) চিনি বা চিনিজাত দ্রব্য।

( ট ) মধু।

( ঠ ) তরল গ্লুকোজ।

( ড ) মল্ট দ্রব্য।

( ট ) ভক্ষযোগ্য শর্করা বা স্টার্চ  ঃ যেমন- পটেটো স্টার্চ , কর্ন ফ্লাওয়ার , টপিওকা ফ্লাওয়ার , ভক্ষণযোগ্য (Edible)বাদাম ফ্লাওয়ার।

( ণ ) ভিটামিন।

( ত ) গ্লিসারিন এবং গ্লিসারিন মনোস্টিয়ারেট।( থ ) চুনের পানি।

( দ ) সরবিটল

( ধ ) লাইসিন ইত্যাদি।

( ন ) মানবর্ধক দ্রব্য । যেমন- অ্যামোনিয়াম পার সালফেট , পটাশিয়াম ক্রোমেট , ক্যালসিয়াম কার্বনেট এবং ক্যালসিয়াম ফসফেট।

( প ) ছত্রাক প্রতিরোধক । যেমন- সোডিয়াম বা ক্যালসিয়াম প্রোপাইওনেট , অ্যাসিটিক এসিড বা ল্যাকটিক এসিড , সােডিয়াম ডাই – অ্যাসিটেট , এসিড সোডিয়াম পাইরোফসফেট এবং এসিড ক্যালসিয়াম ফসফেট।

গমের ময়দার কাজ বা ভূমিকা(Function of wheat flour):

১.গমের ময়দার কাজ(Function of wheat flour)

বেকারী শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ময়দা ব্যবহৃত হয় । এ ময়দা গম , রাই , বার্লি ইত্যাদি চূর্ণ করে তৈরি করা হয় । অন্যান্য ময়দার তুলনায় গমের ময়দা বেকারী খাদ্যদ্রব্যের গুণগত মান ও বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান । গমের ময়দা বেকারী খাদ্যদ্রব্যে নিম্নলিখিত ভূমিকা পালন করে , যেমন-

১। বেকারী দ্রব্যের বিশেষ গঠন তৈরি করে।

২। সুগন্ধ বৃদ্ধি করে।

৩। বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং

৪। পুষ্টিমান বৃদ্ধি করে ।

১.২.গমের প্রকারভেদ ( Wheat variety ):

 ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ময়না তৈরি করতে বিভিন্ন প্রকার গম ব্যবহার করা হয় । আবার ভিন্ন প্রজাতির গমের বিভিন্ন ময়দা বেকারী খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হয় । নিচে বিভিন্ন প্রজাতির গমের ব্যবহার দেয়া হল:

১। বসন্তকালীন শক্ত লাল গম হার্থ এবং প্যান পাউরুটি , রোলবিশেষ পাউরুটি , তাছাড়া ময়দার বেকিং কোয়ালিটি উন্নত করার জন্য ব্যবহার করা হয়।
২। শীতকালীন শক্ত লাল গম প্যান পাউরুটি তৈরিতে , সাধারণত ভাল বেকারী খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার কর হয়।
৩। শীতকালীন নরম লাল গম প্রধানত কেক , কুকি এবং পেস্ট্রি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
৪। সাদা গম নরম লাল গমের তুলনায় কম প্রােটিন সমৃদ্ধ । এটি সাধারণত কেক , পিস , কুকিস এবং অন্যান্য পেস্ট্রি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়

 

১.২.গমের ময়দা তৈরি ( Production of wheat flour ):

ময়দা তৈরির প্রধান এবং প্রথম ধাপ হল চূর্ণ করা , যেখানে গম ভেঙ্গে এন্ডোস্পার্ম ( Endosperm ) , ভুসি ( Bran ) এবং অংকুর ( Germ ) আলাদা হয়ে যায় । গমের এই এন্ডোস্পার্ম অংশ বেকারী শিল্পে ব্যবহৃত হয় । অনেক ক্ষেত্রে ময়দার সাথে  ভুসি এবং অংকুরও ব্যবহার করা হয় ।

ময়দা তৈরির প্রবাহুচিত্রঃ

গম নির্বাচন

(Selection of Wheat)

মিশ্রণ

(Blending)

পরিষ্কারকরণ (Cleaning)

কন্ডিশনিং বা টেম্পারিং (Conditioning or Tempering)

চূর্ণ করা (Milling)

 

টেম্পারিং (Tempering): ময়দা তৈরির প্রক্রিয়ায় গমে পানি যোগ করে তাপ দেয়াকে টেম্পারিং (Tempering) বলে। গম চূর্ণ করার সময় ভুসি ছাড়ানোর জন্য এটা করা হয়।

  • সর্টেনিং, ইমালসিফায়ার এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্টস (Shortening, Emulcifier and Anti- oxidants)

১.৩ সর্টেনিং (Shortening) :

বেকারী খাদ্যে সর্টেনিং (Shortening) এর ব্যবহার অনস্বীকার্য, সুষ্ঠু খামির তৈরি এবং মানসম্মত বেকারী খাদ্য তৈরি নির্ভর করে ব্যবহৃত সর্টেনিং এর প্রকার এবং পরিমাণের উপর। রাসায়নিক বা ভৌত গুণাবলি, কাঁচামাল (যা দিয়ে সর্টেনিং তৈরি) এবং প্রয়োগের উপর ভিত্তি করে সর্টেনিংকে নিম্নোক্ত ভাগে ভাগ করা যায়, যথাঃ

১। প্রাকৃতিক সর্টেনিং (Natural shortening) এবং

২। রূপান্তরিত সর্টেনিং (Modified shortening)।

১.৩.১ প্রাকৃতিক সটেনিং (Natural shortening) :

উদ্ভিজ্জ তেল (Vegetable oils) এবং প্রাকৃতিক চর্বি (Natural fats) প্রাকৃতিক সর্টেনিং এর আওতাভুক্ত। প্রধানত সোয়াবিন তেল, তুলাবীজ তেল (Cotton seed oils) এবং উদজানকৃত (Hydrogenated) উদ্ভিজ্জ তেল সর্টেনিং এর প্রধান কাঁচামাল। এগুলোর দুধের সরের মত স্বাদ আছে। সোয়াবিন বা তুলাবীজ তেল হতে উদজানকৃত চর্বি (Hydrogenated fats) তৈরি করা হয়, যা সর্টেনিং হিসেবে পাউরুটি, রোলস, পেস্ট্রি, আইসিং (কেকের উপরে প্রলেপ দেওয়া) ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হয়। এ জাতীয় তেলে রং মিশিয়ে আইসিং হিসেবে ক্র্যাকারস্ এবং কুকিস্ শিল্পে ব্যবহার করা হয়। কোকোয়া বাটার চকলেটের প্রলেপ হিসেবে এবং অন্যান্য বিশেষ বেকারী ও কনফেকশনারি খাদ্যে ব্যবহার করা হয়

১.৩.২ রূপান্তরিত সর্টেনিং (Modified shortening)

এ জাতীয় সর্টেনিং মার্জারিন এবং তরল সটেনিং এর আওতাভুক্ত। হাইড্রোজেনেশন (Hydrogenation) এবং ইন্টারিয়্যাস্টারিকেশন (Intereasterication) পদ্ধতিতে রূপান্তরিত সর্টেনিং তৈরি করা হয়। কোকোয়া বাটার চকলেটের প্রলেপ হিসেবে এবং অন্যান্য বিশেষ বেকারী ও কনফেকশনারি খাদ্যে ব্যবহার করা

১.৩.৩ ইমালসিফায়ার (Emulcifier)

যেসব পদার্থ দুই বা ততোধিক অমিশ্রণীয় দ্রব্য যেমন তেল বা চর্বি অথবা তেল-চর্বিসমৃদ্ধ খাদ্যদ্রব্য এবং পানি বা পানিসমৃদ্ধ খাদ্যদ্রব্যকে একত্রে মিশ্রিত করতে সাহায্য করে, তাদেরকে ইমালসিফাইং এজেন্ট (Emulcifying Agents) বা ইমালসিফায়ার বলে। সুতরাং এক কথায় বলা যায় যে, দুটি অমিশ্রণীয় দ্রব্যকে সহজে মিশ্রিত করার জন্য ইমালসিফায়ার ব্যবহার করা হয়। বেকারী খাদ্যে ইমালসিফায়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইমালসিফায়ারের কিছু বিধি-নিষেধ থাকার কারণে বেকারী শিল্পে এর ব্যবহার সীমিত। কিছু কিছু বেকারী খাদ্যে স্বল্প পরিমাণে ইমালসিফায়ার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিছু ইমালসিফায়ার স্টার্চ এবং অ্যামাইলোজ দ্বারা তৈরি, যার ফলে বেকারী খাদ্যে এরা জমাট বাঁধার কাজ করে। ইমালসিফায়ার খাদ্যকে সুস্বাদু করে এবং খাদ্যের গঠন উন্নত করে। এরা বেকারী খাদ্যে এবং থামিরে ছোট ছোট দলা বা গুটি বাঁধাকে প্রতিরোধ করে। GMS (Glyceryl Mono Stearate) একটা গুরুত্বপূর্ণ ইমালসিফায়ার। বিভিন্ন ক্যান্ডি এবং কেকের আকৃতি বৃদ্ধিতে GMS ব্যবহার করা হয়। মনো এবং ডাই গ্লিসারাইড, প্রোপাইলেন গ্লিইকল, পেকটিন, সরবিটল ইত্যাদি বেকারী এবং কনফেকশনারি শিল্পে ইমালসিফায়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

১.৩.৪ অ্যান্টি-অক্সিডেন্টস্ (Anti-oxidants) :

যেসব পদার্থের উপস্থিতিতে অটো অক্সিডেশন স্তিমিত হয় সে সব পদার্থকে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট (Anti-oxidants) বলে। বেকারী শিল্পের চর্বিজাতীয় খাদ্য সংরক্ষণ করার পর যে কটুত্ব বা দুর্গন্ধ (Rancid) সৃষ্টি হয়, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সেগুলোকে বাঁধা দেয়। উচ্চ জলীয়কণা সম্পন্ন বেকারী খাদ্য যেমন পাউরুটি, কেক ইত্যাদি সংরক্ষণে সামান্য ভূমিকা রাখে। তাছাড়া ক্র্যাকারস, কুকিস্ এবং স্ন্যাকস্ জাতীয় খাদ্যের গুণগত মান কয়েক মাস ভাল রাখার জন্য অ্যান্টি- অক্সিডেন্ট ব্যবহার করা হয়। সুতরাং বেকারী এবং কনফেকশনারি খাদ্যের স্থায়িত্বকাল (Shelf Life) বৃদ্ধিতে এরা সহায়তা করে। র‍্যানসিডিটি (Rancidity) হল খাদ্যস্থিত চর্বিজাতীয় দ্রব্য ভেঙ্গে আপত্তিকর গন্ধ বা স্বাদ সৃষ্টি করা। এই র‍্যানসিডিটি প্রক্রিয়া হাইড্রোলাইটিক ও অক্সিডেটিভ অক্সিডেশন প্রক্রিয়ায় হয়ে থাকে। বর্তমানে তিনটি রাসায়নিক দ্রব্য অ্যান্টি- অক্সিডেন্ট হিসেবে বেকারী এবং কনফেকশনারি শিল্পের জন্য ব্যবসায়ীকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যথাঃ

১। বিউটাইলেটেড হাইড্রোক্সি এনাইসল (BHA)

২। বিউটাইলেটেড হাইড্রোক্সি টলুইন (BHT) এবং

৩। প্রোপাইল গেলেট (Propyl Gailate)।

সচরাচর অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমূহ খাদ্যের লিপিডের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে শতকরা ০.০২ ভাগ পরিমাণ ব্যবহৃত হয়। অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমূহকে কার্যকরী করার জন্য সাইট্রিক অ্যাসিড বা ফসফরিক এসিড যোগ করা যেতে পারে

খামির ফোলানো দ্রব্য (Leavening agents) :

১.৪ ভূমিকা (Introduction) :

যে সকল দ্রব্য গ্যাস তৈরির মাধ্যমে খামিরকে ফোলায় বা খামির তৈরিতে সাহায্য করে সে সকল দ্রব্যকে লিভেনিং দ্রব্য (Leavening Agents) বলে। রাসায়নিক উপাদান যোগ করে বা ঈস্ট এর সাহায্যে গাজন প্রক্রিয়া হতে তৈরি কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) গ্যাসই হল প্রধান ফোলানো গ্যাস বা লিভেনিং গ্যাস বাল্ক ডেনসিটি (Bulk Density) কমিয়ে আয়তন বৃদ্ধি করাই এ দ্রব্যের প্রধান কাজ। লিভেনিং দ্রব্য হিসেবে সোডিয়াম বা পটাশিয়াম বাইকার্বনেটের লবণ ব্যবহার করা হয়, যা খামিরে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) তৈরি করে বেকারী খাদ্যকে ফোলায়, যেমন, পাউরুটি, কেক, বিস্কুট ইত্যাদি। কুকিস্ এর ক্ষেত্রে যোগকৃত অ্যামোনিয়াম বাইকার্বনেট ভেঙ্গে অ্যামোনিয়া তৈরি করে, যা লিভেনিং দ্রব্য হিসেবে কাজ করে। লিভেনিং দ্রব্যের মূল উপাদান হল-

১। সোডিয়াম বাইকার্বনেট এবং ২। অ্যামোনিয়াম বাইকার্বনেট।

১.৪.১ সোডিয়াম বাইকার্বনেট (NaHCO3) 8

লিভেনিং দ্রব্য হিসেবে বেকারী শিল্পে সোডিয়াম বাইকার্বনেট সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। কারণ সোডিয়াম বাইকার্বনেট দামে সস্তা, কম বিষক্রিয়া, সহজে নাড়াচাড়া করা যায়, স্বাদহীন এবং বিশুদ্ধ হিসেবে পাওয়া যায়। এ দ্রব্যের আরও সুবিধা হল যে, এটা অন্যান্য লিভেনিং দ্রব্যের তুলনায় কম ক্ষারযুক্ত এবং খামিরে সহজেই মিশে যায়।

১.৪.২ অ্যামোনিয়াম বাইকার্বনেট (NH,HCO3) 8

কম জলীয়কণা এবং শুষ্কজাতীয় বেকারী খাদ্য তৈরিতে অ্যামোনিয়াম বাইকার্বনেট লিভেনিং দ্রব্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যেমন- কুকিস। খাদ্যে যদি পানির পরিমাণ বেশি থাকে তাহলে এ জাতীয় লিভেনিং দ্রব্য ব্যবহার করলে অ্যামোনিয়ার গন্ধ সৃষ্টি হয়। অ্যামোনিয়া কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং তাপের কারণে তৈরি বাষ্পের জন্য এরূপ গন্ধের সৃষ্টি হয়। কার্বনেটের যৌগই হল অ্যামোনিয়াম বাইকার্বনেট এবং ব্যবসায়িকভাবে কনফেকশনারি ট্রেডে ভল (Vol) নামে পরিচিত।

১.৪.৩ এসিড লিভেনিং দ্রব্য (Acid leavening agents) 8

খামিরে ব্যবহৃত সোডিয়াম বাইকার্বনেট থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড সম্পূর্ণরূপে উৎপন্ন এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য খুব অল্প পরিমাণে যে অম্লীয় উপাদান (Acidic Compound) ব্যবহার করা হয়, তাকে লিভেনিং এসিড (Leavening Acid) বলে। এসিড লিভেনিং দ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত কিছু লিভেনিং দ্রব্যের নাম নিচে দেওয়া হল, যথা-

১। অম্লীয় ক্যালসিয়াম ফসফেট

২। অম্লীয় সোডিয়াম পাইরোফসফেট

৩। ক্ষারযুক্ত পটাশিয়াম টারটারেট

৪। অম্লীয় টারটারেট ইত্যাদি।

সোডিয়াম অ্যালুমিনিয়াম ফসফেট ব্যবহার করা লাভজনক, কারণ এর নিরপেক্ষ মান (না এসিড না ক্ষার) সবচেয়ে বেশি। অম্লীয় ক্যালসিয়াম ফসফেটের চেয়ে সোডিয়াম বাইকার্বনেটের সাথে অম্লীয় সোডিয়াম ফসফেট ধীরগতিতে বিক্রিয়া করে, ফলে খাদ্যদ্রব্য বেকিং এর পূর্বে গ্যাসের অপচয় কম হয়। এ শ্রেণিভুক্ত আরো কিছু লিভেনিং দ্রব্য হল:

১। সোডিয়াম সালফেট

২। অ্যালুমিনিয়াম সালফেট

৩। গ্লুকো-ডেল্টা-ল্যাকটোন এবং

৪। ডাই-ক্যালসিয়াম ফসফেট ডাইহাইড্রেট।

এখানে মনে রাখা দরকার যে, সমস্ত অম্লীয় লিভেনিং দ্রব্য সোডিয়াম বাইকার্বনেটের উপর নিরপেক্ষ প্রভাব থাকতে হবে

১.৪.৪ ঈস্ট ( Yeast) :

বেকারী শিল্পে খাদ্যদ্রব্য তৈরিতে লিভেনিং দ্রব্য হিসেবে ঈস্ট এর ব্যবহার অপরিসীম। বেকারী খাদ্যে ঈস্ট ব্যবহারের সুবিধা হল, ঈস্ট খাদ্যে স্বাদ এবং সুগন্ধ সৃষ্টির সাথে সাথে অধিক সময় ধরে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) গ্যাস তৈরি করতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাছাড়া অন্যান্য লিভেনিং দ্রব্যের চেয়ে ঈস্ট ব্যয়বহুল।

খামিরে ঈস্ট যোগ করলে ঈস্ট এর প্রার্থমিক কাজ হল গাজন প্রক্রিয়ায় চিনিকে ভেঙ্গে অ্যালকোহল এবং কার্বন ডাই- অক্সাইড (CO₂) গ্যাস উৎপন্ন করে খামিরকে ফুলিয়ে তোলা। এক্ষেত্রে বিক্রিয়াটি হলঃ

C6H12O6 ফার্মেন্টেশন 2CH3OH + 2CO2

এখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) খামিরকে ফোলায় বা স্ফীত করে এবং অ্যালকোহল সুগন্ধির সৃষ্টি করে। ঈস্ট যোগ করার পর খুব সামান্য গ্যাস প্রথমে ২ ঘন্টায় উৎপন্ন হতে পারে, পরবর্তীতে ২-৪ ঘণ্টার মধ্যে কিছু গ্যাস উৎপন্ন হতে পারে এবং ৪-৬ ঘণ্টার মধ্যে গ্যাস উৎপাদন কমে যায়। কাজেই গ্যাস উৎপাদনের জন্য পাউরুটি বেকিং এর পূর্বে যথেষ্ট সময় দেয়া দরকার। ঈস্ট দ্বারা ফার্মেন্টেশন তখনই শুরু হয় যখন খামিরে বিভিন্ন উপাদান যোগ করে মেশানো হয় এবং এ প্রক্রিয়া চলতে থাকে যতক্ষণ না চুল্লির তাপমাত্রা ঈস্ট এনজাইমকে নিষ্ক্রিয় করবে। দক্ষ প্রস্তুতকারীরা খামিরে প্রয়োজনীয় পরিমাণে ঈস্ট যোগ করে তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ের মধ্যে পাউরুটির খামির প্রস্তুত করে থাকে।

বাজারে দু’ধরনের ঈস্ট পাওয়া যায়, যথা-

১। সংকুচিত ঈস্ট (Composed Yeast) এবং

২। শুস্ক ঈস্ট (Dry Yeast(مس

১.৪.৪.১ সংকুচিত ঈস্ট (Composed yeast):

সংকুচিত ঈস্ট-এ মোমের আবরণ দেয়া থাকে। এতে প্রায় ৭০% জলীয়কণা থাকে। কোষগুলোর প্রন্থ গড়ে ৪ – ৬ মাইক্রোন এবং দৈর্ঘ্য ৫-৭ মাইক্রোন। সংকুচিত ঈস্টকে ৪৫° সে. তাপমাত্রায় গুদামজাত করা হলে এর প্রায় ৬.৫% কার্যকারিতা হারায়।

১.৪.৪.২ শুদ্ধ ঈস্ট (Dry yeast) :

শুষ্ক ঈস্টে প্রায় ৯২% কঠিন পদার্থ থাকে। সংকুচিত-ঈস্টের তুলনায় শুষ্ক ঈস্ট এর কিছু সুবিধা আছে। যেমন- শুষ্ক ঈস্ট কক্ষ তাপমাত্রায় ভাল থাকে, পরিমাপ করা সহজ এবং সহজে খামিরে ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেশি। এর ফলে বেকারী কারখানায় এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া এটি শুদ্ধতা এবং অধিক চিনির দ্রবণ সহ্য করতে পারে। ১০০ কেজি সংকুচিত ঈস্ট ও ৪৫ কেজি শুদ্ধ ঈস্ট এর কার্যক্ষমতা একই। শুদ্ধ ঈস্টকে বাতাসে ২১°সে. তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হলে ৪ সপ্তাহে এর কার্যকারিতা ৭৩% কমে যায়। কিন্তু নাইট্রোজেনে সংরক্ষণ করলে প্রতি মাসে এর কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার হার মাত্র ১%। শুষ্ক ঈস্ট ব্যবহারের জন্য ৪০- ৪৩°সে. তাপমাত্রায় পানি দ্বারা পুনঃজলীয়করণ করা উচিত। শুষ্ক ঈস্ট পানিতে ভেজালে কয়েক মিনিটের মধ্যে ভিজে যায় এবং কার্বন ডাই অক্সাইড (CO₂) এর উৎপন্ন বেশি হয়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *